এত ভঙ্গ বঙ্গদেশে তবু রঙ্গে ভরা এটাও কি দেখার বাকি ছিল

এত ভঙ্গ বঙ্গদেশে তবু রঙ্গে ভরা এটাও কি দেখার বাকি ছিল

বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় কিংবদন্তি সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তার দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাকে যে রাজনৈতিক কলাম লিখতেন,

তার নাম দিয়েছিলেন ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’। পাকিস্তান আমলের কথা। আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে বন্দুক এর জোরে ক্ষমতা দখলের পর সারা পাকিস্তানে

রাজনীতি করা এবং রাজনীতি নিয়ে কথা বলা নিষিদ্ধ করে দেন। ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ নামে মানিক মিয়ার রাজনৈতিক কলাম লেখাও বন্ধ হয়ে যায়্।

এত ভঙ্গ বঙ্গদেশে তবু রঙ্গে ভরা এটাও কি দেখার বাকি ছিল।

মানিক মিয়া তখন ঠিক করলেন. তার কলামের নাম হবে ‘রঙ্গমঞ্চ’।

ইত্তেফাকের তখনকার সম্পাতকমন্ডলীর  কেউ কেউ প্রশ্ন তলেছিলেন, রঙ্গমঞ্চ নাটক – থিয়েটারের অভিনয় মঞ্চ। মানিক মিয়া তার কলামে দেশের

নানা অবস্থা নিয়ে আলোচনা করবেন, সেই লেখার শিরোনাম কেমন করে অভিনয় মঞ্চ অর্থাৎ রঙ্গমঞ্চ হয়? মানিক মিয়ার কাছে যখন এ প্রশ্নটি তোল

হলো, তিনি বললেন, অভিনয় মঞ্চ আর রাজনীতির মঞ্চ কি অভিন্ন নয়? রঙ্গমঞ্চে অভিনেত – অভিনেত্রীরা মুখে রঙচঙ মেখে অভিনয় করেন। আর

রাজনীতিতে নেতারা মুখে রংচং না মেখে জনগণের সামনে অভিনয় করেন। পার্থক্যটা কী? রঙ্গমঞ্চের লোকদের বলা হয় অভিনেতা শিশির ভাদুড়ীর

একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নেতা ও অভিনেতাদের মধ্যে পার্থক্য নেই। আমরা অভিনেতারা মুখে রংচং মেখে একটা বদ্ধ

ঘরে দু-পাচশ লোককে হাসাই-কাদাই।  আর নেতারা মুখে রংচং না মেখেই জনসভার মঞ্চে দাড়িয়ে হাজার হাজার লোককে হাসান এবং কাদান।

শিশির ভাদুড়ীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, রাজনীতির মঞ্চ আর অভিনয়ের রঙ্ঘমঞ্চের মধ্যে পার্থক্য নেই বলেই আমার কলামের শিরোনাম

‘রঙ্গমঞ্চ’ দেওয়া চলে। এত ভঙ্গ বঙ্গদেশে তবু রঙ্গে ভরা এটাও কি দেখার বাকি ছিল।

যতদিন পাকিস্তানে সামরিক শাসন চলছিল, ইত্তেফাকে মানিক মিয়া তার কলাম লিখেছেন ‘রঙ্গমঞ্চ’ শিরোনামে।

মানিক মিয়ার রাজনৈতিক কলাম লেখার এই কাহিনি এতকাল পরে উল্লেখ করলাম এ জন্য যে, বাংলাদেশের রাজনীতেতে করোনাভাইরসের ট্র্যাজিডি

যখনম চরমে, তখন ট্র্যাজিডির পাশে  কমেডিও চলতে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য রাজনীতিতে ট্র্যাজেডি ও কমেডি খুব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ব্যিটিশ আমলে

অবিভক্ত বাংলাদেশে যখন ৫০- এর দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ মরছে, তখন তার পাশাপাশি কলকাতার সুরম্য হোটেলগুলোতে চলছিল এই দুর্ভিক

ঘটিয়ে যে ব্যবসায়ীরা লক্ষ লক্ষ টাকা বানিয়েছিলেন তাদের খানাপিনা- আমোদফুর্তি। আবুল মনসুর আহমদ তা নিয়ে স্যাটায়ার লিখে চাবুক

মেরেছিলেন এই ট্র্যাজেডি-কমেডির খলনায়কদের তা ‘ফুড কনপারেন্স’ বইয়ে। এত ভঙ্গ বঙ্গদেশে তবু রঙ্গে ভরা এটাও কি দেখার বাকি ছিল।

আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতেও মনে হয় চলছে এই ট্র্যাজিডি- কমেডির খেলা।

কেবর খলনায়কদের চাবুক মারার কেউ নেই। আজ যদি তফা্জ্জল হোসেন মানিক মিয়া অথবা আবুল মনসুর আহমদ বেচে থাকতেন, তাহলে তাদের

একজনের কলম থেকে হুজুর কেবলা গল্পের দ্বিতীয় পর্ব বেরিয়ে আসত। আমার পাঠকদের অধিকাংশেই সম্ভবত আবুল মনসুর আহমদের বিখ্যাত

গল্পগ্রন্থ ‘আয়না’ পড়েছেন। এই আয়না ছিল তখনকার সমাজের আয়না। এই ‘আয়না’ বইতে হুজুর কেবলা’ গল্পটি সারা অবিভক্ত বাংলাদেশে

তোলপাড় তুলেছিল। আমাদের দেশের একশ্রেণির আলেম ও পীর সাহেবদের আসল চেহারা এই হুজুর কেবলা গল্পে তুলে ধরা হয়েছিল।

দেশের আর উন্নতির পথে এগুতে সম্ভব হলো না।

এক বৃদ্ধ পীর সাহেবের নজর পড়েছিল তারই মুরিদ এক যুবকের সুন্দরী স্ত্রীর দিকে। তিনি তার ভক্তদের এক সমাবেশে অজ্ঞান হয়ে পড়ার ভান

করলেন। ওই অজ্ঞান অবস্থায় তার কাছে দৈব নির্দেশ এলো, পীর সাহেব যেন তার শিষ্যের বউকে বিয়ে করেন। নইলে তার বমিান পূর্ণ হবে না। পীর

সাহেবের ইমান পূর্ণ না হলে তার মুরিদদের ইমানও পূর্ণ হবে না এবং তাদের মৃত্যুর পর সহজে বেহেশতে গমন সম্ভব হবে না্ এ কখা শোনার পর পীর

সাহেবের সকল মুরিদ মিলে ওই যুবককে চাপ দিল তার তরুণী স্ত্রীকে তালাক দিতে। অতঃপর সেই অনিচ্ছুক, ক্রন্দনরতা তরুণীকে পীর সাহেব বিয়ে

করেন। আমি গল্পটির সারাংশ লিখলাম।

 

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *