বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক উন্নয়ন বেরে যাচ্ছ

কৃষি ও কৃষক উন্নয়ন শব্দ দুটি একে অপরের পরিপূরক। কৃষির উন্নয়ন সাধন হলেই কৃষকদের

জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে। তবে আমাদের দেশে কৃষিকাজে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়লেও

তথা কৃষির উন্নয়ন হলেও কৃষকের কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না। বরং বর্তমান যারা কৃষিনির্ভর অর্থনীতির

সঙ্গে যুক্ত তাদের অবস্থা আরো বেগতিক। তারপরও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম।

এ দেশের সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং সার্বিক জীবনপ্রবাহ কৃষিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

বাংলাদেশ এখনো গ্রামীণ বাংলাদেশ-পল্লী বাংলাদেশ। কেননা এ দেশের ৬০-৭০ শতাংশ মানুষ এখনো

গ্রামে বসবাস করে। বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। কৃষিতে ৪১

শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। কৃষি বাংলাদেশের ১৬ দশমিক ৫ কোটি মানুষের শুধু খাদ্য ও পুষ্টির

নিশ্চয়তা বিধান করে না, বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের জোগানও দেয়। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের সার্বিক

অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশের আবহাওয়া ও উর্বর জমি সারা বছর

ধরে বিভিন্ন ধরনের ফসল ও সবজি উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। এ দেশের কৃষক ফসলের

পাশাপাশি আদিমকাল থেকে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালন করেন। বাড়ির আঙিনায় নানা পদের

শাকসবজি আবাদ করেন।

বাড়ির আশপাশে পুকুর, ডোবা-নালা থাকলে সেখানে মাছ চাষ করেন।

সেই সঙ্গে দেশের প্রাকৃতিক জলাশয়-নদী, খাল-বিল, সমুদ্রে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। তাই বলা যায়, কৃষি

অর্থনীতির মূল উপখাত মোট চারটি প্রথমত ফসল, দ্বিতীয়ত প্রাণিসম্পদ, তৃতীয়ত মৎস্য ও চতুর্থ বন

উল্লেখযোগ্যভাবে বিদ্যমান। তৎকালীন সময় থেকেই বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্যের জন্য বিখ্যাত।

তাঁতশিল্প, কুটিরশিল্পের কারণে বাংলা ছিল ভারতবর্ষের সবচেয়ে সম্পদশালী অঞ্চল। এ কারণে খুব

সহজেই বিদেশি শাসকগোষ্ঠীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশে। দীর্ঘকাল যাবত শাসন ও শোষণের

জন্য দিল্লির মোগল ও ইংরেজ শাসকদের সর্বোচ্চ অর্থসম্পদের উৎস ছিল বাংলা। সর্বশেষ পাকিস্তানি

শাসকগোষ্ঠী ঔপনিবেশিক শাসকদের ন্যায় একটানা ২৩ বছর সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশের সম্পদ লুণ্ঠন

করে বর্তমান পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে। এভাবে বাংলার কৃষক ছিল চিরদিন শোষণ-

শাসনের শিকার, চিরবঞ্চিত ও অবহেলিত।

হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করলেও তার সুফল কখনো ভোগ করতে পারেনি।

সামন্ত ভূস্বামী, জমিদার, মহাজনদের দ্বারা প্রতারণা ও শোষণের জাঁতাকলের কারণে তাদের দুঃখ-কষ্টের

সীমা ছিল না। ৭১-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশেও কৃষককে তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্যের জন্য যখন

আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়, তখন তা খুবই দুঃখজনক। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কৃষিতে

প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। তবে তার সুফল কতটুকু প্রান্তিক কৃষকরা পাচ্ছেন, তা

প্রশ্নসাপেক্ষ। সরকার যেভাবে কৃষিতে আধুনিক বিপ্লবের কথা প্রচার করছে, সেভাবে সুফল কৃষকরা

পাচ্ছেন না। বিশেষ করে কৃষিবাজার ব্যবস্থায় সরকারের যে অবস্থাপনার চিত্র এই করোনাকালে ফুটে

উঠেছে তা হতাশাজনক। কৃষকের উৎপাদিত প্রায় সব পণ্যের বাজার সরকারের ছত্রছায়ায় মানুষের

দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রতিনিয়ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে চাহিদামাফিক ধান-চাল, সবজি ইত্যাদি উৎপাদন

করেও দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের এত দাম হওয়ার পরও

কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের দাম থেকে বঞ্চিত। ধানের মৌসমে সরকার ধানের যে মূল্য নির্ধারণ করে

দেয়, সেই দাম কৃষক পান না। একজন কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্ট করে, সার, বীজ, পানি

ইত্যাদি বাকি নিয়ে ধান উৎপাদন করেন। ধান মাড়াই করার পরই এই বাকি টাকাগুলো পরিশোধ

করতে হয়।

কৃষক ধান মাড়াই করার পর সঙ্গে সঙ্গে যদি ধান বিক্রি করতে না পারেন তাহলে ঋণ পরিশোধ করবে কীভাবে।

সুযোগ নিচ্ছে একপ্রকার অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী। সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া দামের চেয়ে

কম মূল্যে কৃষকের থেকে ধান ক্রয় করে বেশি দামে সরকারের কাছে বিক্রি করে মুনাফার অংশ ঘরে

তুলছে। ফলে সরকার ন্যায্যমূল্যে ধান কিনলেও তার সুফল কৃষক পাচ্ছেন না। সরকার কৃষিতে

উন্নয়নের কথা বলে বারবার বীজ, তেল, কারেন্ট বিলসহ সব কিছুর দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি করেছে।

সেই সঙ্গে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে ধান মাড়াই করার ব্যয় বৃদ্ধিতে। ১ বিঘা জমির ধান কেটে বাড়ি

নিয়ে এসে তা মাড়াই করতে অঞ্চলভেদে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে ধান উৎপাদনে

অনেক কৃষক অনীহা দেখাচ্ছেন, যা দেশের জন্য শুভ সংবাদ নয়। ধান রোপণ থেকে শুরু করে মাড়াই

করা পর্যন্ত যে খরচ হয়, সেই ধান বিক্রি করে কৃষকের লোকসান গুনতে হচ্ছে। যে কারণে মধ্যবিত্ত

কৃষক ও নিম্ন মধ্যবিত্ত কৃষক একদম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাতায় নাম লেখাচ্ছেন। যার প্রমাণ ইতোমধ্যে

আমরা পেয়েছি। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের প্রান্তসীমায়

চলে গেছে। করোনার কারণে ৫৬ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। কৃষকদের সঙ্গে সব সময় অন্যায়

করা হয়। বিশেষ করে প্রতিবেশী বন্ধু দেশের পেঁয়াজকান্ডে আমরা হতবাক। তার পরও মৌসুমি পেঁয়াজ

যখন বাজারে আসতে শুরু করেছে, কৃষকরা যখন পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার কথা ভাবছেন, ঠিক

তখনি সরকার আবার ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি উন্মুক্ত করে। এভাবেই এই দেশের কৃষকদের

ফসলের সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

অথচ ভারত সরকার কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বেশ কয়েকবার পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে।

যার ফল বাংলাদেশের জনগণ ভোগ করেছে। করোনায় দফায় দফায় চালের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো

সিন্ডিকেট এই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, সরকারের অজানা নয়। অথচ কোনো এক অদৃশ্য

কারণে সরকার যেন এই সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়। যার ফল দেশের গরিব মানুষগুলোই ভোগ করে।

করোনাকালীন দেশের কৃষিসংশ্লিষ্ট পাটশিল্প ও চিনিশিল্পকে বেহাল করে দেওয়া হলো। গত ২ জুলাই

একযোগে দেশের ২৫ পাটকল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অপরদিকে ১৫ রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের মধ্য ইতোমধ্যে

৬টি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যার ফলে পাট ও আখ উৎপাদনে জড়িত কৃষক এবং এর সঙ্গে জড়িত

অনেকগুলো পরিবার হয় ক্ষতিগ্রস্ত। এদিকে করোনাকালীন সুপার সাইক্লোন আম্পানের আঘাতে দেশের

কৃষি খাত চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আম্পানের আঘাতে বেড়িবাঁধ ভেঙে বহু কৃষকের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জমিতে লোনাপানি ঢুকে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সেই কয়েক দফা বন্যায় মৌসুমি আম, লিচু

ছাড়াও সব ধরনের সবছি আউশ ধানের চারা ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, আম্পানের প্রভাবে ২৫-২৬ জেলায় ১ লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

টাকার অঙ্কে যা ১ হাজার ১০০ কোটি। অথচ প্রতি বছর যে বেড়িবাঁধ ভেঙে হাজার হাজার হেক্টর

ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাজারো পরিবারের সপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। তার পরেও বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে

কেমন একটা মন্থরতা। বেড়িবাঁধ নির্মাণে যে দুর্নীতি হয় তা রোধেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ নেই।

ঘুরেফিরে এই গরিব কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। করোনার কারণে সরকার ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার

কৃষি প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করছে, কিন্তু সেই সেবা প্রান্তিক অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। প্রকৃত

কৃষকরা সেই ঋণের সুবিধা পাচ্ছেন না এমন অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। সরকার যেমন আধুনিক

কৃষির ওপর জোর দিচ্ছে, তেমনিভাবে কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে জোর পদক্ষেপ নেবে এটাই

প্রত্যাশা। কৃষির উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকর পদক্ষেপ নেওয়া

অত্যন্ত জরুরি। কৃষকরাই জীবনের শেষ সময় প্রর্যন্ত রাষ্ট্রের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য কাজ করে।

অথচ এই দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রকে সেবা দেওয়া কৃষক নামের যোদ্ধাদের কোনো স্বীকৃতি নেই। তাই

স্বীকৃতিস্বরূপ কৃষকদের নির্দিষ্ট বয়সের পর অবসর ভাতা প্রদান করাই হবে তাদের অবদানের শ্রেষ্ঠ

পুরস্কার।

News Reporter

২ thoughts on “বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক উন্নয়ন বেরে যাচ্ছ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *